আমাদের শিক্ষাব্যাবস্থা – কি হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতে?

সারা পৃথিবীর শিক্ষাব্যাবস্থার চিত্রটাই মোটামুটি একই রকম

কেন আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষকরা এত saddist ছিলেন?  তারা সামান্য পড়া না পারার জন্য পুরা ক্লাসের সামনে এমন ভাবে অপমান করতেন যেন আমরা খারাপ ছাত্রই শুধু না, আমরা মাত্রই মানুষ খুন করেছি।  জ্যামিতি ক্লাসে জ্যামিতি বক্স নিয়ে না আসার অপরাধে প্রথমে বেতের বাড়ি, তারপর যতক্ষণ ক্লাস শেষ না হয় ততক্ষণ কান ধরে বেঞ্চের উপর দাড়িয়ে থাকার মত ক্রিয়েটিভ শাস্তির আইডিয়া আমাদের শিক্ষকরা কোথা থেকে পেয়েছেন আমার জানা নেই। 

আচ্ছা কখনো কি চিন্তা করে দেখেছেন আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা কেমন ধরনের মানুষ প্রডিউস করছে? যাদেরকে আমরা শিক্ষিত বলে জানি তাদের ভেতরটা আসলে কেমন? তারা কেমন ধরনের নলেজ নিয়ে বের হচ্ছে?

আমার স্কুল জীবনে আমি ৯৯% শিক্ষককে খুবই ভয় পেয়েছি, আমাদের সম্পর্ক ছিল ভয়ের, ভালবাসার না। কোন টিচার আমার মাথায় হাত রেখে কখনো আমাকে আশির্বাদ দেয় নাই, কিন্তু সামান্য ভুলে বেতের বাড়ি খেয়েছি বহুবার। এমনও হয়েছে, ক্লাসের পিছনে বসে কথা বলার অপরাধে মারতে মারতে  ক্লাসের সামনে থেকে পেছনে, আবার পেছন থেকে সামনে নিয়ে এসেছে, কানে ধরে পুরা স্কুলের সামনে বারান্দায় দাড় করিয়ে রেখেছে, চুলের মুঠি ধরে এত জোরে টান মেরেছে যে অনেকদিন সেই  পাশে কাত হয়ে ঘুমাতে পারতাম না।

আজকে এসএসসি পাশের প্রায় ২১ বছর পর সেই দিনগুলোর কথা যখন চিন্তা করি, তখন মনে হয় কেন আমাদের বেশির ভাগ শিক্ষকরা এত saddist ছিলেন?  তারা সামান্য পড়া না পারার জন্য পুরা ক্লাসের সামনে এমন ভাবে অপমান করতেন যেন আমরা খারাপ ছাত্রই শুধু না, আমরা মাত্রই মানুষ খুন করেছি।  জ্যামিতি ক্লাসে জ্যামিতি বক্স নিয়ে না আসার অপরাধে প্রথমে বেতের বাড়ি, তারপর যতক্ষণ ক্লাস শেষ না হয় ততক্ষণ কান ধরে বেঞ্চের উপর দাড়িয়ে থাকার মত ক্রিয়েটিভ শাস্তির আইডিয়া আমাদের শিক্ষকরা কোথা থেকে পেয়েছেন আমার জানা নেই। 

কিন্তু চিন্তা করে দেখেন, এই যে শিক্ষকরা ছাত্রদের সাথে এমন ব্যবহার করেন, কিসের জন্য? তারা আমার শিক্ষক কারণ তারা আমার চেয়ে হয়ত ১৫/২০/২৫ বছর আগে লেখা পড়া করেছেকন, শিক্ষকথা করছেন মানুষ গড়ার কারিগর হিসাবে।  আমি যদি তাদের মত ২০/২৫ বছর আগে জন্মাতাম, তাহলে ত তারা আমার শিক্ষক হতেন না।  সোজা কোথা, তারা আমার আগে জন্মেছেন বলেই আমার শিক্ষক হয়েছেন।  এতাইতো সবচে বড় যোগ্যতা তাইনা? তারা আমার আগে জন্মেছেন। তেমনি আজকে যারা শিক্ষক, ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াচ্ছেন, তারা এই বাচ্চাদের আগে জন্মেছেন বলেই এদের শিক্ষক হয়েছেন, বাচ্চাদের চেয়ে পরে জন্মালে তো আর এই বাচ্চাদের শিক্ষক হতেন না।

যা বলছিলাম আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা সম্পর্কে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন ভাবে সাজানো হয়েছে (আমি শুধু বাংলাদেশের কোথা বলছি না, প্রায় পুরা বিশ্বের শিক্ষা ব্যাবস্থাই অনেকটা এমন) এখানে মেমরি বা মনে রাখার প্রয়োজনীয়তা সবচে বেশি। যে যত বেশি মনে রাখতে পারবে, তার ভ্যালু তত বেশি। এখানে নতুন  নলেজ সৃষ্টি করার চেয়ে পুরাণ যা আছে তাই মুখস্ত করে চলার নিতিতে বেশি জোর দেওয়া হয়। পুরা শিক্ষা ব্যাবস্থাই এমন ভাবে করা হয়েছে যে আপনি এখান থেকে ঠিক মত বের হতে পারলে ভাল একজন employee হবেন এই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই, এমনকি আমাদের সমাজ ব্যাবস্থাও আপনাকে বাহবা দিনে ভাল employee  হুয়ার জন্য।  ব্যাঙ্ক আপনাকে লোন দিবে যদি আপনার রেগুলার জব থাকে, আর যদি আপনি ব্যাবসা করেন, যেখানে লাভ লস সব আছে তখন ব্যাঙ্ক আপনাকে লোণ দিতে অনেক হিসাব নিকাষ করবে। 

রকফেলার ছিলেন আধুনিক আমেরিকার শিক্ষা ব্যাবস্থা ঢেলে সাজানোর মুল কারিগর। রকফেলার তৎকালীন আমেরিকার শিক্ষা মন্ত্রীকে আদেশ দিয়েছিলেন যে এমন একটা শিক্ষা ব্যাবস্থা বানানো হয় যেখানে তার কল কারখানা চালানোর জন্য কখনো ইঞ্জিনিয়ারের কমতি না হয়। অর্থাৎ ভাল employe  গড়ে তোলাই ছিল রকফেলারের মেইন উদ্দেশ্য।

সামনে কি অপেক্ষা করছে এই শিক্ষা ব্যাবস্থা থেকে যারা বের হয়েছে তাদের জন্য?

একটা সময় ছিল যখন কলকারখানায় মানুষ কাজ করত। গাড়ি তৈরি হত সম্পুর্ন মানুষের হাত দিয়ে। আস্তে আস্তে গত ৫০/৬০ বছরে কলকারখানায় মানুষের জায়গাগুলা মেশিন নিতে আরম্ভ করল। মানুষ চাকরি হারাতে শুরু করল। প্রথম প্রথম খুব আন্দোলন হত, কিন্তু পড়ে দেখা গেল যে এটাই নরমাল নিয়মে পরিণত হয়েছে।  প্রথম যখন চট্টগ্রাম বন্দরে ক্রেইন বসানো হল, তখন শ্রমিকরা অনেক আন্দোলন করল কারণ তারা জব হারাবে। কিন্তু লাভ হয় নাই, বন্দরের কর্মকাণ্ড অনেক বেশি গতিশীল হল ক্রেইন বসানর পড়। যে জাহাজ খালি করতে আগে শ্রমিকদের ২ দিন লাগত, সে জাহাজ খালি করতে ক্রেইনের লাগল দুই ঘণ্টা, ফলে বন্দরে অনেক বেশি জাহাজ ভিড়তে লাগল, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ল।

এখন জারা জব করছে তাদের জন্য হুমকি হয়ে এসেছে আর্টিফিসিয়াল ইন্টালিজেন্স। জারাই এখন মেমোরি বেইজড কাজ করছে, মোটামুটি সবাই জব হারাবে। কিন্তু জারা সত্যিকারের ক্রিয়েটিভ কাজ করছে, যেমন আর্টিস্ট, তাদের কাজ রোবট এত সহজে করতে পারবে না এখনো, কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে অনেক জব  চলে যাবে রোবটদের দখলে, শিক্ষকদের দরকার হবে না ক্লাস করানোর, কারণ রোবটের মেমোরি অনেক বেশি দক্ষ শিক্ষকদের মেমোরির থেকে। রোবট ক্লাসে এসে অঙ্ক বিজ্ঞান সব গর গর করে পড়াবে বাচ্চাদের। তাই কি এখন শিক্ষকরা আন্দোলন শুরু করবে?  ইতিমদ্যেই সালমান খান একাডেমী দেখিয়ে দিয়ছে শুধুমাত্র ইউটিউবকে ব্যবহার করে কি ভাবে একজায়গা থেকে সারা পৃথিবীর বাচ্চাদের পড়ালেখা শেখানো যায়, কোন ক্লাস রুমের দরকার নাই, দরকার শুধুমাত্র একটা কম্পিউটার, সাথে ইন্টারনেট এবং নিজের সদিচ্ছা।

আসলে টেকনোলজি একটা চমৎকার জিনিস যদি আমরা তাকে ঠিকমত ব্যবহার করতে পারি। মানুষ যেদিন থেকে আগুণ আবিষ্কার করেছে, সেদিন থেকে সভ্যতা তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। আবার এই আগুণ লেগে অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়াতে প্রতিবছর বুশ ফায়ারে কত শত প্রাণী এবং মানুষ মারা যাচ্ছে, তাতে আগুণের দোষ কতটা আবার মানুষের কর্মের ফলে প্রকৃতির পরিবর্তনের প্রভাব কতটা ?  একটা ছুরি দিয়ে আমরা একটা আম কেটে খেয়ে আমাদের জীবন বাঁচাতে পারি আবার সে একই ছুরি দিয়ে মানুষ খুন করতে পারি। এখানে ছুরির কোন দোষ নাই, দোষ যে ব্যাবহার করছে  তার, ঠিক সেই ভাবে টেকনোলজির কোন দোষ থাকতে পারে না, দোষ যদি কাওকে দিতেই হয় তবে তা হবে মানুষের, আরও ভাল ভাবে বললে তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের।  

শেষ করার আগে একটা প্রশ্ন। আচ্ছা এখন পর্যন্ত এই পৃথিবীর যত ক্ষতি করা হয়েছে (global warming, 1st and second world war, any sort of war/atomic war/religious/ethnic war etc) , তা কারা করেছে? শিক্ষিত মানুষ নাকি অশিক্ষিতের জাত?

ছবি :https://www.youtube.com/watch?v=LTAvi4ZAHxU